১. খাদ্য ও পুষ্টির প্রাথমিক ধারণা
- খাদ্য (Food): মানবদেহের গঠন, বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, কাজের ক্ষমতা অর্জন ও শারীরিক সুস্থতার জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন, সেসব উপাদানবিশিষ্ট বস্তুই খাদ্য। খাদ্য আমাদের শক্তি জোগায় এবং দেহে তাপ উৎপন্ন করে।
- খাদ্যের প্রকারভেদ (উৎসের ওপর ভিত্তি করে): খাদ্যবস্তুকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
- জৈববস্তু: শর্করা, প্রোটিন, চর্বি বা স্নেহ ইত্যাদি আমরা জীব থেকে পাই।
- অজৈববস্তু।
- পুষ্টি (Nutrition): পুষ্টি হচ্ছে প্রতিদিনের একটি প্রক্রিয়া, যা জটিল খাদ্যকে ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করে দেহে গ্রহণের উপযোগী করে তোলে। রক্তের মাধ্যমে জীবকোষ এই সরল উপাদানগুলো শোষণ করে নেয়, যা দেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, শক্তি উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
২. খাদ্যের মূল উপাদান
খাদ্যের উপাদানগুলোকে প্রধানত ৬টি ভাগে ভাগ করা যায়:
- শর্করা (Carbohydrate): প্রধানত দেহগঠন, ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধি সাধন ও শক্তি জোগাতে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
- প্রোটিন বা আমিষ (Protein): দেহের গঠন ও বৃদ্ধির জন্য প্রধান উপাদান।
- স্নেহ বা চর্বি (Fat/Lipid): দেহে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করে।
- ভিটামিন (Vitamin): রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও দেহকে সুস্থ রাখে।
- খনিজ লবণ (Mineral Salts): বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ পরিচালনায় সাহায্য করে।
- পানি (Water): দেহের গঠন ও অভ্যন্তরীণ কাজ পরিচালনা করে।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহজাতীয় খাদ্য আমাদের মূল শক্তি জোগায়, আর ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি দেহকে রোগমুক্ত ও সবল রাখতে সাহায্য করে)
৩. খাদ্য উপাদানগুলোর বিস্তারিত আলোচনা
ক. শর্করা (Carbohydrate)
- উৎস: চাল, আটা, ময়দা, ভুট্টা, আলু, চিনি, গুড় ইত্যাদি (প্রধানত উদ্ভিজ্জ উৎস)।
- কাজ:
- সহজে হজম হয় এবং দেহের কাজ করার শক্তি ও তাপ উৎপন্ন করে।
- শর্করায় বিদ্যমান সেলুলোজ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
- পরীক্ষা: খাদ্য দ্রব্যে (যেমন: আটার দ্রবণ) আয়োডিন দ্রবণ যোগ করলে তা গাঢ় বেগুনি বর্ণ ধারণ করে, যা শর্করার উপস্থিতি নির্দেশ করে।
খ. প্রোটিন বা আমিষ (Protein)
- শ্রেণিবিভাগ:
- প্রাণিজ প্রোটিন: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য।
- উদ্ভিজ্জ প্রোটিন: ডাল, বাদাম, শিম ও বরবটির বীজ।
- কাজ:
- দেহের বৃদ্ধির জন্য কোষ গঠন করা (যেমন: পেশি, হাড়, রক্তকণিকা)।
- দেহে শক্তি উৎপন্ন করা।
- রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি তৈরি করা।
- অভাবজনিত রোগ: শিশুদের খাদ্যে প্রোটিনের অভাব ঘটলে কোয়াশিয়রকর রোগ হয়, যার ফলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও গঠন বাধাগ্রস্ত হয় এবং শিশু অপুষ্টিতে ভোগে।
গ. স্নেহ বা চর্বি (Fat / Lipid)
- শ্রেণিবিভাগ:
- প্রাণিজ স্নেহ: চর্বি, ঘি, মাখন, মাছের তেল।
- উদ্ভিজ্জ স্নেহ: সয়াবিন, সরিষা, তিল, বাদাম, জলপাই ইত্যাদির তেল।
- কঠিন ও তরল অবস্থা: মাংসের চর্বি, ঘি ও মাখন জমাট স্নেহ; অন্যদিকে সয়াবিন, সরিষা ও তিলের তেল তরল স্নেহ।
- কাজ:
- দেহের তাপ ও কর্মশক্তি বাড়ায়।
- ত্বকের নিচে চর্বিস্তরে দেহের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- দেহের প্রোটিনকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে।
- দেহে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে-এর যোগান দেয়।
ঘ. ক্যাশরি ও শক্তি পরিমাপ
- ক্যালরি (Calorie): ১ গ্রাম পানির তাপমাত্রা ১° সেলসিয়াস বাড়াতে প্রয়োজনীয় তাপ হচ্ছে ১ ক্যালরি।
- কিলোক্যালরি (Kcal): ১০০০০ ক্যালরি = ১ কিলোক্যালরি।
- খাদ্যের তাপশক্তি: খাদ্যের তাপশক্তি মাপার একক হলো কিলোক্যালরি। শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহজাতীয় খাদ্য থেকে দেহে তাপ উৎপন্ন হয়।
- ক্যালরির তারতম্য:
- উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্য: ভোজ্যতেল, ঘি, মাখন, মাছের তেল, ঘন নারকেলের দুধ, ভাজা চিনা বাদাম, চিনি, মধু ইত্যাদি।
- নিম্ন ক্যালরিযুক্ত খাদ্য: চাল কুমড়া, বাঁধাকপি, ঝিঙা, শালগম, টমেটো, ডাটা, লাউ, পালংশাক, পটল ইত্যাদি।
- প্রয়োজনীয়তা: একজন মানুষের প্রতিদিন কত ক্যালরি প্রয়োজন, তা তার বয়স, ওজন, দৈহিক উচ্চতা ও পরিশ্রমের ধরণের ওপর নির্ভর করে।
ঙ. ভিটামিন (Vitamin / খাদ্যপ্রাণ)
ভিটামিন খাদ্যে অতি সামান্য মাত্রায় থাকা জৈব পদার্থ, যা প্রাণীর স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয়।
|
ভিটামিন
|
প্রধান উৎস
|
প্রয়োজনীয়তা / কাজ
|
|
ভিটামিন-এ
|
কলিজা, ডিম, মাখন, পনির, মাছ, সবুজ শাকসবজি, গাজর, আম, কাঁঠাল, পাকা পেঁপে
|
দেহের বৃদ্ধি, দৃষ্টিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
|
|
ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স
|
ডিম, কলিজা, বৃক্ক, মাংস, দুধ, গম, লাল চাল, পনির, শিম, বাদাম
|
দেহের বৃদ্ধি, হ্রদপিণ্ড, স্নায়ু ও পরিপাক ব্যবস্থার সুষ্ঠু কাজ সম্পাদন ও ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।
|
|
ভিটামিন-সি
|
লেবু, কমলা, আমলকী, পেয়ারা, জাম্বুরা, টমেটো, কচুশাক, কলমিশাক
|
সুস্থ-সবল হাড়, দাঁত, মাড়ি গঠন ও মুখের ক্ষত সারায়। (রন্ধনে বা মজুদ রাখলে নষ্ট হয়ে যায়)
|
|
ভিটামিন-ডি
|
দুধ, মাখন, ডিম, মাছের তেল (সূর্যের আলোতে ত্বক এটি তৈরি করতে পারে)
|
ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস ব্যবহারে সাহায্য করে, সুস্থ হাড় ও দাঁত গঠন করে।
|
চ. খনিজ লবণ (Mineral Salts)
দেহের ওজনের প্রায় ১% অংশ লবণ। খনিজ লবণ দেহ গঠন, অভ্যন্তরীণ কাজ (যেমন: পেশি সংকোচন, স্নায়ু উদ্দীপনা) নিয়ন্ত্রণ করে।
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ লবণের উৎস ও প্রয়োজনীয়তা:
- ক্যালসিয়াম: দুধ, মাংস, সবুজ শাকসবজি। (কাজ: দাঁত ও হাড়ের সুস্থতা, রক্ত জমাট বাঁধা)।
- ফসফরাস: দুধ, মাংস, ডিম, ডাল। (কাজ: সুস্থ দাঁত ও হাড় গঠন)।
- লোহা (Iron): মাংস, ফল, সবুজ শাকসবজি। (কাজ: রক্তে লোহিত কণিকা বৃদ্ধি ও রক্তস্বল্পতা দূর করা)।
- আয়োডিন: সামুদ্রিক শৈবাল, সামুদ্রিক মাছ, মাছের তেল, আয়োডিনযুক্ত লবণ। (কাজ: থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ পরিচালনা ও গলগণ্ড রোগ প্রতিরোধ)।
- সোডিয়াম: সাধারণ লবণ, নোনা ইলিশ, পনির। (কাজ: কোষ ও দেহরসের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা)।
- পটাসিয়াম: মাছ, দুধ, ডাল, আখের গুড়। (কাজ: পেশি সংকোচনে ভূমিকা রাখা)।
ছ. পানি ও রাফেজ (Water & Roughage)
- পানি (Water):
- মানবদেহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) অংশ পানি।
- জীবন রক্ষার কাজে অক্সিজেনের পরেই পানির স্থান।
- কাজ: খাদ্য গলাধঃকরণ, পরিপাক, শোষণ ও সংবহনে সাহায্য করে; শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে এবং বর্জ্য নিষ্কাশন করে।
- রাফেজ (Roughage):
- শস্যদানা, ফল ও সবজির অপাচ্য বা আঁশযুক্ত অংশকে রাফেজ বলে।
- এটি মূলত সেলুলোজ নির্মিত কোষ প্রাচীর।
- কাজ: পরিপাকের পর অপরিবর্তিত থাকে এবং মল তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
৪. সুষম ও অসুষম খাদ্য (Balanced & Unbalanced Diet)
- সুষম খাদ্য: যে খাদ্য তালিকায় শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সবগুলো খাদ্য উপাদান (শর্করা, প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি) সঠিক পরিমাণে থাকে, তাকে সুষম খাদ্য বলে।
- অসুষম খাদ্য: খাদ্য তালিকায় ৬টি উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকলে বা কোনো একটি কম/অনুপস্থিত থাকলে তাকে অসুষম বা অসম খাদ্য বলে।
- অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতা: দেহে প্রয়োজনীয় উপাদান ও পুষ্টির অভাব ঘটলে অপপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়।
- স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্য অভ্যাসের নিয়মাবলী:
- শর্করা জাতীয় খাদ্য প্রয়োজনমতো খেতে হবে।
- যথেষ্ট পরিমাণ শাকসবজি খেতে হবে।
- মিষ্টি, তেল বা চর্বিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে।
- অতিরিক্ত লবণ খাওয়া পরিহার করতে হবে।
৫. দ্রুত পুনরালোচনা (এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য)
- খাদ্য মূলত ৩ প্রকার (প্রধান কাজের ওপর ভিত্তি করে) এবং খাদ্য উপাদান ৬ প্রকার।
- ভিটামিন ও খনিজ লবণ আলাদা কোনো নির্দিষ্ট খাদ্য নয়, এগুলো শাকসবজি ও ফলমূলে থাকে।
- অতিরিক্ত প্রোটিন বা শ্বেতসার গ্রহণ করা উচিত নয়।
- আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড এবং প্রোটিনের অভাবে কোয়াশিয়রকর রোগ হয়।
- রান্নায় বা তাপে ভিটামিন-সি নষ্ট হয়ে যায়।
- পানির অভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য ও বিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে।
খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে ২০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ) এবং তাদের সঠিক উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. উপাদান ও গুণাগুণ বিচারে খাদ্যকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
ক) ২ ভাগে
খ) ৩ ভাগে
গ) ৪ ভাগে
ঘ) ৬ ভাগে
উত্তর: খ) ৩ ভাগে
২. কোনটি পরিপাক হয়ে দেহে গ্রহণের জন্য শোষণ উপযোগী সরল উপাদানে পরিণত হয়?
ক) জটিল উপাদান
খ) সহজ উপাদান
গ) মৌলিক উপাদান
ঘ) অজৈব বস্তু
উত্তর: ক) জটিল উপাদান
৩. খাদ্যে শর্করা আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে কোন দ্রবণ ব্যবহার করা হয়? ক) লবণের দ্রবণ
খ) চুনের পানি
গ) আয়োডিন দ্রবণ
ঘ) এসিডের দ্রবণ
উত্তর: গ) আয়োডিন দ্রবণ
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে শর্করার কোন উপাদানটি সাহায্য করে?
ক) গ্লুকোজ
খ) সেলুলোজ
গ) প্রোটিন
ঘ) ফ্যাট
উত্তর: খ) সেলুলোজ
৫. শিশুদের খাদ্যে প্রোটিনের অভাব ঘটলে কোন রোগ হয়? ক) গলগণ্ড
খ) কোয়াশিয়রকর
গ) রাতকানা
ঘ) স্কার্ভি
উত্তর: খ) কোয়াশিয়রকর
৬. উদ্ভিজ্জ স্নেহের উদাহরণ কোনটি?
ক) ঘি
খ) মাখন
গ) সরিষার তেল
ঘ) মাছের তেল
উত্তর: গ) সরিষার তেল
৭. ১ গ্রাম পানির তাপমাত্রা ১° সেলসিয়াস বাড়াতে প্রয়োজনীয় তাপকে কী বলে?
ক) ১ ওয়াট
খ) ১ ক্যালরি
গ) ১ কিলোক্যালরি
ঘ) ১ জুল
উত্তর: খ) ১ ক্যালরি
৮. খাদ্যের তাপশক্তি মাপার একক কোনটি?
ক) সেন্টিগ্রেড
খ) ক্যালরি
গ) কিলোক্যালরি
ঘ) গ্রাম
উত্তর: গ) কিলোক্যালরি
৯. নিচের কোনটি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্য?
ক) ভোজ্যতেল
খ) চাল কুমড়া
গ) বাঁধাকপি
ঘ) পটল
উত্তর: ক) ভোজ্যতেল
১০. কোন ভিটামিন রান্নে অথবা মজুদ রাখলে নষ্ট হয়ে যায়?
ক) ভিটামিন-এ
খ) ভিটামিন-বি
গ) ভিটামিন-সি
ঘ) ভিটামিন-ডি
উত্তর: গ) ভিটামিন-সি
১১. কিসের সাহায্যে আমাদের শরীরের চামড়া ভিটামিন-ডি তৈরি করতে পারে?
ক) চাঁদের আলোতে
খ) সূর্যের আলোতে
গ) বাতাসের স্পর্শে
ঘ) পানির সাহায্যে
উত্তর: খ) সূর্যের আলোতে
১২. মানবদেহের ওজনের কত শতাংশ লবণের পরিমাণ থাকে?
ক) ১%
খ) ২%
গ) ৫%
ঘ) ১০%
উত্তর: ক) ১%
১৩. গলগণ্ড রোগ প্রতিরোধে কোন খনিজ লবণ জরুরি?
ক) ক্যালসিয়াম
খ) আয়োডিন
গ) আয়রন
ঘ) সোডিয়াম
উত্তর: খ) আয়োডিন
১৪. রক্তের লালকণিকা বৃদ্ধি করে রক্তস্বল্পতা দূর করে কোনটি?
ক) লোহা
খ) পটাসিয়াম
গ) ক্লোরিন
ঘ) সোডিয়াম
উত্তর: ক) লোহা
১৫. দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষা ও হাইড্রোক্লোরিক এসিড তৈরিতে সাহায্য করে কোনটি?
ক) ক্লোরিন
খ) সোডিয়াম
গ) ম্যাগনেসিয়াম
ঘ) আয়োডিন
উত্তর: ক) ক্লোরিন
১৬. আমাদের দেহের কত অংশ পানি?
ক) এক-তৃতীয়াংশ
খ) দুই-তৃতীয়াংশ
গ) অর্ধেক
ঘ) তিন- চতুর্থাংশ
উত্তর: খ) দুই-তৃতীয়াংশ
১৭. ফল ও সবজির তন্তুময় বা আঁশযুক্ত অংশকে কী বলে?
ক) ভিটামিন
খ) রাফেজ
গ) প্রোটিন
ঘ) এনজাইম
উত্তর: খ) রাফেজ
১৮. রাফেজ কী দ্বারা নির্মিত কোষ প্রাচীর ছাড়া আর কিছুই নয়?
ক) গ্লুকোজ
খ) স্টার্চ
গ) সেলুলোজ
ঘ) ফ্রুক্টোজ
উত্তর: গ) সেলুলোজ
১৯. খাদ্য উপাদান প্রধানত কয় প্রকার?
ক) ৩ প্রকার
খ) ৪ প্রকার
গ) ৫ প্রকার
ঘ) ৬ প্রকার
উত্তর: ঘ) ৬ প্রকার
২০. নিচের কোনটি প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্য থেকে তৈরি হয়ে দেহে রোগ প্রতিরোধ করে?
ক) হরমোন
খ) অ্যান্টিবডি
গ) এনজাইম
ঘ) শর্করা
উত্তর: খ) অ্যান্টিবডি
খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ক ১০টি সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও সহজ ভাষায় তাদের বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. সুষম খাদ্য (Balanced Diet) কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সুষম খাদ্য বলতে বোঝায় যে খাদ্যে দেহের চাহিদা অনুযায়ী প্রোটিন, শর্করা, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি—এই ছয়টি উপাদান সঠিক পরিমাণে থাকে। স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, কর্মশক্তি উৎপাদন এবং শরীরকে রোগমুক্ত রাখার জন্য সুষম খাদ্য গ্রহণ করা জরুরি। দৈনিক খাবারে শর্করা ও প্রোটিনের পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি রাখা প্রয়োজন। সুষম খাদ্যের অভাবে অপষ্টি বা পুষ্টিহীনতা দেখা দিতে পারে। খাবারে শর্করার আধিক্য বেশি হলেও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে কাজ করার শক্তি হ্রাস পায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
২. ভিটামিন সি-এর প্রয়োজনীয়তা কী এবং তা কোন খাদ্যে পাওয়া যায়?
ভিটামিন সি শরীরের স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি হাড়, দাঁত, দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখতে এবং শরীরের যেকোনো ক্ষত বা ঘা দ্রুত সারাতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি-এর প্রধান উৎস হলো লেবু, কমলা, আমলকী, পেয়ারা, জাম্বুরা, টমেটো, কচুশাক ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজি। মনে রাখা প্রয়োজন যে ভিটামিন সি তাপে সংবেদনশীল, তাই রান্না করলে বা অনেক দিন মজুদ করে রাখলে এটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খাদ্যে এ ভিটামিনের ঘাটতি হলে দাঁতের মাড়ি দুর্বল হওয়া ও স্কার্ভির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. দেহে পানির প্রধান কাজগুলো কী কী?
জীবদেহে অক্সিজেনের পরেই পানির অবস্থান, যা খাদ্যের একটি অপরিহার্য উপাদান। মানবদেহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পানি। এটি খাদ্য পরিপাক, গলধঃকরণ ও পুষ্টি উপাদান শোষণে দ্রাবক হিসেবে কাজ করে। পানি রক্তকে তরল রেখে সংবহনে সাহায্য করে এবং শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে। এছাড়া মলমূত্রের মাধ্যমে দেহের ক্ষতিকর ও বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ অপসারণেও পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানির অভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য, বিপাক ক্রিয়ায় বিঘ্ন এবং রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই প্রতিদিন পরিমিত ও নিরাপদ পানি পান করা আবশ্যক।
৪. প্রোটিন বা আমিষ খাদ্যের প্রধান কাজ কী?
প্রোটিন বা আমিষের প্রধান কাজ হলো দেহের বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণের জন্য কোষ গঠন করা। দেহের পেশি, হাড়, রক্তকণিকা ইত্যাদি প্রোটিন দ্বারা গঠিত। এছাড়া প্রোটিন থেকে দেহে রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং শক্তি উৎপাদিত হয়। প্রোটিন দুই ধরনের—প্রাণিজ (যেমন: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ) ও উদ্ভিজ্জ (যেমন: ডাল, বাদাম, সিমের বীজ)। শিশুদের খাদ্যে প্রোটিনের অভাব ঘটলে কোয়াশিয়রকর রোগ হয়, যা স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও দৈহিক গঠন ব্যাহত করে। তবে অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করাও শরীরের জন্য উচিত নয়।
৫. খাদ্যে রাফেজ (Fiber) বা আঁশের গুরুত্ব কী?
শস্যদানা, ফলমূল ও সবজির অপাচ্য বা অঁাশযুক্ত অংশকে রাফেজ বলে। রাফেজ পুষ্টি হিসেবে সরাসরি শোষিত বা পরিপাক না হলেও এটি পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। এটি প্রধানত সেলুলোজ দিয়ে নির্মিত উদ্ভিদ কোষপ্রাচীর। পরিপাক প্রক্রিয়ার পর রাফেজ অপরিবর্তিত থেকে যায় এবং মানবদেহে মল তৈরিতে ও তা সহজে নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এটি পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। দৈনিক খাদ্যে ফলমূল ও শাকসবজি যুক্ত করলে শরীর পর্যাপ্ত রাফেজ পায়।
৬. ক্যালরি কী এবং তা কীভাবে খাদ্যের শক্তি নির্দেশ করে?
ক্যালরি হলো খাদ্যের শক্তি ও তাপ উৎপাদনের মাপকাঠি। ১ গ্রাম পানির তাপমাত্রা ১° সেলসিয়াস বাড়াতে যে পরিমাণ তাপশক্তি প্রয়োজন, তাকে ১ ক্যালরি বলে। ১০০০ ক্যালরি সমান ১ কিলোক্যালরি। খাদ্য গ্রহণ করার পর পরিপাক ও বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়, যা শ্বাসকার্য, রক্তসংবহন ও শারীরিক চালনার কাজে ব্যবহৃত হয়। তেল, চর্বি, শর্করা ও প্রোটিন জাতীয় খাদ্য থেকে বেশি ক্যালরি পাওয়া যায়। মানুষের বয়স, ওজন, উচ্চতা ও শারীরিক পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরির পরিমাণ ভিন্ন হয়।
৭. আয়োডিনের অভাবে কী রোগ হয় এবং এটি কীভাবে রোধ করা যায়?
আয়োডিন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ লবণ। খাদ্যে আয়োডিনের অভাব ঘটলে থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা দেখা দেয় এবং 'গলগণ্ড' বা ঘ্যাঘ রোগ হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে আয়োডিন প্রয়োজন। সামুদ্রিক মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল এবং মাছের তেল আয়োডিনের মূল প্রাকৃতিক উৎস। সাধারণ খাবার লবণের সাথে আয়োডিন মিশিয়ে আয়োডাইজড লবণ তৈরি করা হয়। দৈনন্দিন রান্নায় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই এই খনিজ লবণের ঘাটতি মেটানো ও গলগণ্ড রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
৮. স্ফীত বা অতিরিক্ত চর্বি (Fat) জাতীয় খাবার খাওয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো কী?
তেল, ঘি, মাখন বা চর্বিজাতীয় খাবার থেকে প্রচুর তাপশক্তি ও ক্যালরি পাওয়া যায়। তবে এসব খাদ্য অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ফ্যাটযুক্ত খাবার অতিরিক্ত খেলে দেহে চর্বি জমতে শুরু করে, যা স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের কারণ হয়। এর ফলে রক্তনালীতে চর্বি জমে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য মিষ্টি, অতিরিক্ত চর্বি ও ভাজা পোড়া খাবার কম খেয়ে প্রোটিন, শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খাওয়া উচিত।
৯. অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতা বলতে কী বোঝায়?
দেহের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যের বিভিন্ন উপাদান, যেমন—প্রোটিন, শর্করা, ভিটামিন বা খনিজ লবণের সঠিক পরিমাণের চেয়ে কম উপস্থিতি থাকলে দেহে পুষ্টির ঘাটতি ঘটে। একে অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতা বলা হয়। সাধারণত খাদ্যে পর্যাপ্ত সুষম উপাদানের অভাব থাকলে বা দীর্ঘদিন একঘেয়ে খাবার গ্রহণ করলে অপুষ্টি দেখা দেয়। অপুষ্টির ফলে স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, কাজের ক্ষমতা ও শক্তি কমে যায় এবং শরীর সহজেই নানা রোগে আক্রান্ত হয়। এটি প্রতিরোধে পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
১০. ভিটামিন-ডি এর উৎস ও প্রধান কাজগুলো কী কী?
ভিটামিন-ডি মানবদেহের হাড় ও দাঁতের গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান কাজ হলো খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সাহায্য করা এবং হাড় ও দাঁতকে সুস্থ-সবল রাখা। দুধ, মাখন, ডিম ও মাছের তেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ডি থাকে। এছাড়া আমাদের ত্বক সূর্যালোকের বা সূর্যের আলোর স্পর্শে এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিটামিন-ডি তৈরি করতে পারে। খাদ্যে এ ভিটামিনের অভাব হলে শিশুদের রিকেটস বা হাড় বেঁকে যাওয়ার সমস্যা এবং বয়স্কদের হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সৃজনশীল প্রশ্ন ১
উদ্দীপক: জয়া ও জীতু দুই বন্ধু। জয়া প্রায়ই শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার কারণে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। জীতু ওদের বাড়ি গিয়ে জানতে পারলো জয়া ডিম, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজি একেবারেই খায় না, কেবল সামান্য ভাত, মাছ ও মাংস খায়। অন্যদিকে জীতু নিয়মিত শাকসবজি, ফলমূল ও পরিমিত অন্যান্য খাবার গ্রহণ করে সুস্থ থাকে।
ক. খাদ্যের তাপশক্তি মাপার একক কী?
খ. রাফেজ বলতে কী বোঝায়?
গ. জয়ার খাদ্য তালিকায় কোন ধরনের উপাদানের ঘাটতি রয়েছে এবং এর ফল কী হচ্ছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. সুস্থ জীবনযাপনের জন্য জয়ার খাদ্যাভ্যাসে কী ধরনের পরিবর্তন আনা উচিত? জীতুর খাদ্যাভ্যাসের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ১:
ক. খাদ্যের তাপশক্তি মাপার একক হলো কিলোক্যালরি।
খ. ফলমূল ও শাকসবজির অপাচ্য, তন্তুময় বা আঁশযুক্ত অংশকে রাফেজ বলা হয়। এটি মূলত সেলুলোজ নির্মিত উদ্ভিদ কোষপ্রাচীর। রাফেজ পরিপাক না হলেও মল ত্যাগে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
গ. জয়ার খাদ্য তালিকায় প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও রাফেজের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। উদ্দীপক অনুযায়ী, জয়া কেবল সামান্য ভাত (শর্করা) এবং মাছ-মাংস খায়। ডিম, দুধ, ফল-মূল ও শাকসবজি না খাওয়ার কারণে তার দেহে প্রয়োজনীয় ভিটামিন (যেমন: এ, বি, সি) এবং খনিজ লবণের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই উপাদানগুলোর অভাবে তার দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছে না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে এবং সে সামান্য কাজেই ক্লান্তি ও দুর্বলতা বোধ করে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
ঘ. সুস্থ জীবনযাপনের জন্য জয়াকে তার একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস বদলে সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য দেহে প্রোটিন, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি—এই ৬টি উপাদান সঠিক পরিমাণে থাকা প্রয়োজন। জয়া কেবল শর্করা ও সামান্য প্রোটিন গ্রহণ করায় অপুষ্টিতে ভুগছে।
তার উচিত জীতুর মতো দৈনিক খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল যুক্ত করা, যা তাকে ভিটামিন ও খনিজ লবণ সরবরাহ করবে। এছাড়া হাড় ও দেহের সুস্থতার জন্য ডিম ও দুধ খাওয়া প্রয়োজন। কেবল ভাত-মাছ না খেয়ে নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে জয়ার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং সে জীতুর মতো সুস্থ ও চঞ্চল হয়ে উঠবে।
সৃজনশীল প্রশ্ন ২
উদ্দীপক: নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফসান টিফিনের সময় টেস্টটিউবে কিছুটা আটার দ্রবণ নিয়ে তাতে আয়োডিন দ্রবণ যোগ করে লক্ষ্য করলো দ্রবণটি বেগুনি বর্ণ ধারণ করেছে। অন্যদিকে তার ছোট ভাই রিয়ানের শরীরে কোয়াশিয়রকর রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় ডাক্তার তাকে প্রতিদিন মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল খাওয়ানোর পরামর্শ দিলেন।
ক. আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে খাদ্যের কোন উপাদান শনাক্ত করা যায়?
খ. ভিটামিন-সি কে কেন রান্নে বা মজুদ রাখলে নষ্ট হয়ে যায় বলা হয়?
গ. রাফসানের পরীক্ষার মাধ্যমে খাদ্য উপাদানের যে পরিবর্তন দেখা গেল তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ডাক্তার রিয়ানকে যে খাবারগুলো খাওয়ার পরামর্শ দিলেন, শিশুর দৈহিক গঠনে তার ভূমিকা মূল্যায়ন করো।
উত্তর ২:
ক. আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে খাদ্যে শর্করার উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়।
খ. ভিটামিন-সি তাপ ও বায়ুর সংস্পর্শে সংবেদনশীল। উচ্চ তাপে রান্না করলে বা অনেক দিন বাতাসে উন্মুক্ত রেখে মজুদ করলে এর রাসায়নিক গঠন ভেঙে যায় ও গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই ফলমূল কাঁচা খাওয়া এবং শাকসবজি অতিরিক্ত তাপ না দিয়ে রান্না করা উচিত।
গ. রাফসানের পরীক্ষায় আটার দ্রবণে আয়োডিন যোগ করায় বেগুনি বর্ণ ধারণের মাধ্যমে প্রমানিত হয় যে আটা একটি শর্করা জাতীয় খাদ্য। শর্করা শনাক্তকরণের নিয়ম হলো, শর্করাযুক্ত খাবারের সাথে আয়োডিন দ্রবণ মিশালে তার বর্ণ পরিবর্তিত হয়। আটাতে প্রচুর পরিমাণে শ্বেতসার বা শর্করা থাকে। গরম আটার মিশ্রণে পাতলা আয়োডিন দ্রবণ যোগ করার পর তা বিক্রিয়া করে গাঢ় বেগুনি বর্ণ ধারণ করে। এ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় খাদ্যে শর্করার উপস্থিতি রয়েছে।
ঘ. ডাক্তার রিয়ানকে প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার (মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল) খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুর সঠিক বৃদ্ধি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনে প্রোটিনের ভূমিকা অপরিসীম। প্রোটিনের প্রধান কাজ হলো দেহের বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণের জন্য নতুন কোষ গঠন করা। শিশুদের শরীরে প্রোটিনের অভাব ঘটলে 'কোয়াশিয়রকর' রোগ হয়, যার ফলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি স্তব্ধ হয়ে যায় ও শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। ডাক্তার কর্তৃক নির্দেশিত প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন রিয়ানের দেহের পেশি, হাড় ও রক্তের লোহিত কণিকা গঠনে সাহায্য করবে। এছাড়া প্রোটিন রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি তৈরি করে রিয়ানকে সুস্থ রাখবে। অতএব, রিয়ানের পুষ্টিহীনতা দূর করতে ও দৈহিক গঠনে এই খাদ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৩
উদ্দীপক: শাহিন ও কবির দুই ভাই। শাহিনের বয়স ১২ বছর, সে প্রতিদিন নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা করে। অন্যদিকে কবিরের বয়স ৫ বছর। মা দুজনকেই প্রতিদিন দুধ ও ডিম দেন, তবে শাহিনকে খাবারে বেশি ভাত ও রুটি দেওয়া হয় এবং কবিরকে দেয়া হয় মাছ ও ডালের শুপ।
ক. ১ ক্যালরি কাকে বলে?
খ. প্রোটিনকে উৎস অনুযায়ী কয় ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী?
গ. শাহিনকে বেশি শর্করা জাতীয় খাদ্য দেওয়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. শাহিন ও কবিরের দৈনন্দিন ক্যালরির প্রয়োজনীয়তা কি সমান? উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ৩:
ক. ১ গ্রাম পানির তাপমাত্রা ১° সেলসিয়াস বাড়াতে প্রয়োজনীয় তাপশক্তিকে ১ ক্যালরি বলে।
খ. প্রোটিনকে উৎসের ওপর ভিত্তি করে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১. প্রাণিজ প্রোটিন (যেমন: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ) এবং ২. উদ্ভিজ্জ প্রোটিন (যেমন: ডাল, বাদাম, সিমের বীজ)।
গ. শাহিন ১২ বছরের একজন কিশোর এবং সে নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা করে, তাই তার প্রচুর শারীরিক শক্তির প্রয়োজন। শর্করা হলো দেহের প্রধান শক্তি উৎপাদনকারী উপাদান। শর্করা সহজে পরিপাক হয়ে দেহে কাজ করার ক্ষমতা বা শক্তি জোগায় এবং তাপ উৎপন্ন করে। শাহিনের মতো পরিশ্রমী ও খেলাধুলায় সক্রিয় কিশোরের দেহে শর্করা জাতীয় খাবার (ভাত ও রুটি) দ্রুত ক্যালরি সরবরাহ করে তার দৈহিক ক্লান্তি দূর করে এবং কর্মক্ষম রাখে। তাই তাকে বেশি শর্করা দেওয়া পুরোপুরি যৌক্তিক।
ঘ. না, শাহিন ও কবিরের দৈনন্দিন ক্যালরির প্রয়োজনীয়তা সমান নয়। কোনো মানুষের প্রতিদিন কত ক্যালরি বা তাপশক্তি প্রয়োজন তা নির্ভর করে তার বয়স, ওজন, দৈহিক উচ্চতা ও পরিশ্রমে ধরণের উপর। শাহিন বয়সে বড় এবং নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রম করে। বেশি শারীরিক পরিশ্রমের কারণে তার শরীরে প্রচুর শক্তির ক্ষয় হয়, ফলে তার উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্যের প্রয়োজন। অন্যদিকে, ৫ বছরের কবিরের দৈহিক বৃদ্ধি দ্রুত ঘটছে কিন্তু শাহিনের তুলনায় তার শারীরিক পরিশ্রম কম। কবিরের ক্যালরির চেয়ে কোষ গঠনের জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন বেশি। তাই বয়স ও পরিশ্রমের ভিন্নতার কারণে শাহিনের ক্যালরি চাহিদা কবিরের চেয়ে অনেক বেশি।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৪
উদ্দীপক: রহিমনের গলায় বড় এক ধরণের ফোলা বা টিউমারের মতো দেখা দিল, ডাক্তার বললেন এটি গলার থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার ফল। অন্যদিকে সাহিদা মুখে ও মাড়িতে ঘা এবং রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতায় ভুগছে। ডাক্তার রহিমনকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ও সামুদ্রিক মাছ এবং সাহিদাকে শাকসবজি, লোহাসমৃদ্ধ খাবার ও লেবু খাওয়ার পরামর্শ দিলেন।
ক. রক্তে লালকণিকা বৃদ্ধি করে রক্তস্বল্পতা দূর করে কোন খনিজ উপাদান?
খ. সূর্যের আলো কীভাবে আমাদের শরীরে কাজ করে?
গ. রহিমনের রোগটির কারণ এবং প্রতিকারের উপায় উদ্দীপকের আলোকে আলোচনা করো।
ঘ. সাহিদার শারীরিক সমস্যা দূরীকরণে ডাক্তারের দেওয়া খাদ্য পরামর্শের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ৪:
ক. লোহা (Iron) রক্তের লালকণিকা বৃদ্ধি করে রক্তস্বল্পতা দূর করে।
খ. সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে বা চামড়ায় ভিটামিন-ডি তৈরি করতে সাহায্য করে। ভিটামিন-ডি খাদ্য থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে আমাদের শরীরের হাড় ও দাঁতকে মজবুত ও সুস্থ-সবল রাখে।
গ. রহিমনের রোগটির নাম 'গলগণ্ড', যা মূলত খাদ্যে আয়োডিন নামক খনিজ লবণের অভাবে হয়ে থাকে। আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে সাহায্য করে। খাদ্যে দীর্ঘ দিন আয়োডিনের অভাব ঘটলে গলায় অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায়, যাকে গলগণ্ড রোগ বলা হয়। এ রোগ প্রতিকারে সামুদ্রিক মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল ও মাছের তেল খাওয়া উচিত। এছাড়া রান্নায় সাধারণ লবণের বদলে আয়োডিনযুক্ত বা আয়োডাইজড লবণ ব্যবহার করলে খুব সহজেই দেহ পর্যাপ্ত আয়োডিন পায় এবং গলগণ্ড রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
ঘ. সাহিদা মূলত দুই ধরনের সমস্যায় ভুগছে—দাঁতের মাড়ির সমস্যা (ভিটামিন-সি এর অভাব) এবং রক্তস্বল্পতা (লোহার অভাব)। ডাক্তার সাহিদাকে লোহাসমৃদ্ধ খাবার (যেমন: মাংস, সবুজ শাকসবজি, ফল) খেতে বলেছেন যা রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে তার রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতা দূর করবে। অন্যদিকে, লেবু, পেয়ারা ও সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর ভিটামিন-সি রয়েছে, যা মুখের ঘা শুকাতে ও দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। একই সাথে এটি হাড় ও দাঁতকে মজবুত করে। সুতরাং, সাহিদার রোগমুক্তির জন্য ডাক্তারের এই সুনির্দিষ্ট খনিজ উপাদান ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়ার পরামর্শটি অত্যন্ত কার্যকর।
সৃজনশীল প্রশ্ন ৫
উদ্দীপক: বিজ্ঞান শিক্ষক ক্লাসে খাদ্যের উপাদান ও পুষ্টি নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। তিনি বললেন, "আমাদের দেহের দুই-তৃতীয়াংশই একটি বিশেষ দ্রাবক উপাদান দিয়ে তৈরি, যা জীবন রক্ষার কাজে অক্সিজেনের পরেই স্থান দখল করে আছে। এছাড়া শাকসবজিতে পাওয়া অপাচ্য তন্তুময় অংশও দেহের বর্জ্য নিষ্কাশনে দারুণ ভূমিকা রাখে।"
ক. আমাদের দেহের ওজনের কত শতাংশ লবণ থাকে?
খ. উচ্চ ক্যালরিযুক্ত ও নিম্ন ক্যালরিযুক্ত খাদ্যের পার্থক্য কী?
গ. শিক্ষকের উল্লেখিত প্রথম উপাদানটির (পানির) শারীরিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
ঘ. "দ্বিতীয় উপাদানটি পরিপাক না হলেও মানবদেহের জন্য অপরিহার্য"— বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ৫:
ক. আমাদের দেহের ওজনের প্রায় ১% পরিমাণ খনিজ লবণ থাকে।
খ. যে সকল খাদ্যে তেল, চর্বি, প্রোটিন বা শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে এবং যা থেকে দেহে বেশি তাপশক্তি উৎপন্ন হয়, তাকে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্য বলে (যেমন: ঘি, ভোজ্যতেল, বাদাম)। অন্যদিকে, যে খাদ্যে পানি ও সেলুলোজের পরিমাণ বেশি থাকে এবং যা খুব কম তাপশক্তি দেয়, তাকে নিম্ন ক্যালরিযুক্ত খাদ্য বলে (যেমন: চাল কুমড়া, শসা, পটল)।
গ. শিক্ষকের উল্লেখিত প্রথম উপাদানটি হলো 'পানি'। মানবদেহের গঠন ও সুস্থতার জন্য পানির অবদান অপরিসীম। পানির প্রধান কাজগুলো হলো: ১. দ্রাবক হিসেবে: পানি পরিপাকিত খাদ্য উপাদানগুলোকে দ্রবীভূত করে কোষের গ্রহণ উপযোগী করে। ২. রক্ত সঞ্চালন: পানি রক্তকে তরল রাখে, যা সারা দেহে পুষ্টি ও অক্সিজেন সঞ্চালনে ভূমিকা রাখে। ৩. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: পানি দেহের অতিরিক্ত উত্তাপ ঘাম হিসেবে বের করে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে। ৪. বর্জ্য অপসারণ: পানি মলমূত্রের মাধ্যমে দেহের ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ বাইরে বের করে দেয়। পানির অভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।
ঘ. শিক্ষকের উল্লেখিত দ্বিতীয় উপাদানটি হলো 'রাফেজ' বা আঁশযুক্ত খাদ্য। রাফেজ হলো ফলমূল ও শাকসবজির সেলুলোজ নির্মিত তন্তুময় অংশ, যা আমাদের পৌষ্টিকনালীতে পরিপাক বা হজম হয় না এবং অপরিবর্তিত থাকে। পরিপাক না হওয়া সত্ত্বেও এটি আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কারণ: ১. এটি পরিপাকনালীর মধ্য দিয়ে খাদ্যের অবশিষ্টাংশ ঠেলে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। ২. এটি মানবদেহে মল তৈরিতে ও তা পরিপাকতন্ত্র থেকে সহজে নিষ্কাশন করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ৩. রাফেজ যুক্ত খাবার খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা যায়। অতএব, সরাসরি কোনো পুষ্টি বা শক্তি না দিলেও পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ ও সচল রাখার জন্য রাফেজ মানবদেহে অপরিহার্য।
Comments